ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের নতুন ভরসা পেতার সুচিচ
- by Maria Sultana
- June 29, 2026
- 1 views
ছবি: সংগৃহীত
গোল করাই তার প্রধান পরিচয় নয়। বরং ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের গতি তৈরি এবং সময়কে নিজের মতো পরিচালনা করার দক্ষতাই পেতার সুচিচকে আলাদা করে তোলে। ক্রোয়েশিয়ার এই তরুণ মিডফিল্ডারকে দেখে মনে হয়, তিনি বল নিয়ে দৌড়ান না—বরং বলকেই সঠিক পথ দেখান। তার খেলায় নেই অযথা তাড়াহুড়ো বা বাড়তি নাটকীয়তা। আছে ধৈর্য, দূরদৃষ্টি, নিখুঁত হিসাব এবং ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।
২০০৩ সালের ২৫ অক্টোবর বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ছোট্ট শহর লিভনোতে জন্মগ্রহণ করেন পেতার সুচিচ। জন্মস্থান এক হলেও তার হৃদয়ের পরিচয় ছিল ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে। ক্রোয়েশিয়ান পরিবারে বেড়ে ওঠা সুচিচ ছোটবেলা থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি স্বপ্ন পূরণ এবং নিজেকে গড়ে তোলার দীর্ঘ এক যাত্রা।
তার শৈশবের পথচলা খুব বেশি আলোচিত ছিল না। এনকে স্পোর্ট প্রিভেন্ট, ইসক্রা বুগইনো এবং পরে জ্রিনস্কি মোস্তারের বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি। ইউরোপের বড় মঞ্চে ওঠার আগে অপেক্ষার মূল্য, সুযোগকে কাজে লাগানোর গুরুত্ব এবং প্রতিটি ম্যাচ যে পরবর্তী ধাপের দরজা খুলে দিতে পারে—এসব শিক্ষা তিনি সেখান থেকেই অর্জন করেন।
২০২২ সালে তার ক্যারিয়ারে আসে বড় পরিবর্তন। ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দিনামো জাগরেব তাকে দলে ভেড়ায়। তবে অনেক তরুণ ফুটবলারের মতো তাকেও প্রথমে ধারে ফিরে যেতে হয় জ্রিনস্কিতে। অনেকের কাছে সেটি পিছিয়ে যাওয়া মনে হলেও সুচিচ সেই সময়টাকেই নিজের উন্নতির সেরা সুযোগে পরিণত করেন।
জ্রিনস্কিতে থাকাকালে তিনি শুধু নিয়মিত খেলেননি, নিজের সামর্থ্যেরও প্রমাণ দিয়েছেন। দলকে লিগ ও কাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি দেখিয়েছেন, প্রতিভার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতাও তার রয়েছে।
দিনামো জাগরেবে ফিরে আসার পর তার খেলার ধরনে আরও পরিপক্বতা আসে। মাঝমাঠে তিনি হয়ে ওঠেন দলের সংযোগস্থল। রক্ষণ থেকে আক্রমণে বল পৌঁছে দেওয়া, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং খেলায় ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে তার প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে। দেশীয় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কাড়েন তিনি। তার পাসিং রেঞ্জ, খেলা পড়ার দক্ষতা এবং চাপের মধ্যেও শান্ত থাকার গুণ ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজর কাড়ে।
২০২৫ সালে তার ক্যারিয়ারে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইন্টার তাকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দলে নেয়।
ইন্টারে যোগ দেওয়া শুধু ক্লাব পরিবর্তন ছিল না, বরং ইউরোপীয় ফুটবলে তার অবস্থান আরও দৃঢ় হওয়ার একটি বার্তাও ছিল। অনেকের বিশ্বাস, ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের পরবর্তী বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠতে পারেন পেতার সুচিচ।
তার খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বহুমুখিতা। স্বাভাবিকভাবে তিনি একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও প্রয়োজনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেও সমান দক্ষ। প্রতিপক্ষের প্রেসিং ভাঙতে যেমন পারেন, তেমনি আক্রমণে উঠে সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে তার সক্ষমতা তাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।
জন্ম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় হলেও জাতীয় দলের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ক্রোয়েশিয়াকে। কারণ সেখানেই রয়েছে তার শিকড়, পরিবার এবং আবেগের বন্ধন।
২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। উয়েফা নেশনস লিগে গোল করে তিনি জানিয়ে দেন, তিনি শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাই নন, বর্তমান দলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ব ফুটবলে ক্রোয়েশিয়া বরাবরই অসাধারণ সব মিডফিল্ডার উপহার দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন এক নাম হিসেবে উঠে আসছেন পেতার সুচিচ।
তার সামনে এখনও অনেক পথ, অনেক চ্যালেঞ্জ এবং অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে তিনি শুধু ম্যাচ খেলতে আসেননি, নিজের একটি সময় গড়ে তুলতেও এসেছেন।
ফুটবলের ইতিহাসে কেউ আলোয় দাঁড়িয়ে কিংবদন্তি হন, আবার কেউ ছায়া থেকে উঠে এসে আলোর সংজ্ঞাই বদলে দেন। পেতার সুচিচ যেন সেই নতুন আলোরই আরেকটি অধ্যায়।

