বছর শেষেও কাটেনি পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের উৎকণ্ঠা
- by Ibrahim Akon
- December 28, 2025
- 23 views
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের লোগো কোলাজ
ডেস্ক রিপোর্ট: ২০২৫ সালকে দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের বছর বলা হলেও বাস্তবে বছরজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তাই বেশি অনুভব করেছেন গ্রাহকেরা। বিশেষ করে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য পুরো বছর কেটেছে চরম দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন হলেও বছর শেষে এসেও সাধারণ গ্রাহকেরা নির্বিঘ্নে নিজেদের জমানো অর্থ তুলতে পারেননি।
একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা এই পাঁচ ব্যাংক হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। তীব্র তারল্যসংকটে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
এই সংকট নিরসনে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক পিএলসি গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে অধিগ্রহণ করবে।
মালিকানা ও পটভূমি
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার–এর মালিকানাধীন। বাকি চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম–এর নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
বছরজুড়ে সংকট
বছরের শুরু থেকেই এসব ব্যাংকে নগদ টাকার তীব্র সংকট দেখা দেয়। অনেক শাখায় দিনে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকার বেশি উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং নতুন আমানত না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বছরের শেষ প্রান্তে এসেও রাজধানীর বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের ভিড় দেখা গেলেও তা মূলত জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়।
নিয়ন্ত্রকের আশ্বাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন, কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না এবং গ্রাহকদের টাকা হারাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তার জন্য গ্যারান্টি সুবিধা চালু করেছে। পাশাপাশি আমানত বিমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বছর শেষে এসেও তা কার্যকর হয়নি।
শাস্তির প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে এসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন শূন্যে নেমে আসবে। তবে ব্যাংক লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক মামলা করেছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।
গ্রাহকের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে একটি নির্দিষ্ট স্কিম তৈরির কাজ করছে। প্রস্তাবিত স্কিম অনুযায়ী—
-
যাঁদের হিসাবে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, তাঁরা পুরো অর্থ তুলতে পারবেন।
-
দুই লাখ টাকার বেশি থাকলে তিন মাসে এক লাখ টাকা দেওয়া হবে।
-
বাকি অর্থের ওপর নতুন করে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হবে।
এই প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন ব্যাংকের অগ্রগতি
মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে নতুন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের সাবেক ও বর্তমান আমলাদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা—এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের আমানত শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
নতুন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেছেন, সরকারি মালিকানায় ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়া একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। মূল লক্ষ্য হবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

